রবীন্দ্রনাথ ও সাজ্জাদ জহীর
সাজ্জাদ জহীর ১৯৬৫ সালে ‘প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের তিরিশ বছর’ নাম দিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন নিজ মাতৃভাষা উর্দুতে। এই প্রবন্ধটি তাঁর মৃত্যুর পরে একটি সংকলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৩৫ থেকে ১৯৬৫, এই তিরিশ বছরের প্রগতি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত বিশ্লেষণে রবীন্দ্রনাথ এসেছেন পুরোভাগে। এতে রবীন্দ্রনাথের একটি দুষ্প্রাপ্য বক্তব্য এবং রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সাজ্জাদ জহীরের মূল্যায়ন আমাদের মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ নব নব প্রজন্মের কাছে কত প্রাসঙ্গিক।
সাজ্জাদ জহীর এই প্রবন্ধে লিখেছেন: “প্রেমচাঁদ, জোশ মলিহাবাদী ও সুমিত্রানন্দন পন্থ প্রগতি লেখক সংঘ ও তার আন্দোলনকে বৈপ্লবিক প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। তবে এঁদের সবাইকে সম্ভবত বক্তব্যের দিক থেকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”
এই বক্তব্যের যুক্তি হিসাবে সাজ্জাদ জহীর ১৯৩৮ সালে এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সম্মেলনে প্রেরিত রবীন্দ্রনাথের একটি বাণীর পুরোটা তাঁর প্রবন্ধে উদ্ধৃত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের এই বাণীটি একই সময়ে প্রগতি লেখক সম্মেলনের জন্য প্রেরিত রবীন্দ্রনাথের সাধারণভাবে প্রচলিত বাণীটি থেকে স্বতন্ত্র। সাধারণভাবে প্রচলিত বাণীটিতে রবীন্দ্রনাথ মূলত প্রাচ্যের মুক্তি সংগ্রাম ও অভ্যুদয়ের প্রধান প্রতিবন্ধক রূপে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভেদ বিভেদের প্রতি সাহিত্যের কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং তুরস্কের কামাল পাশাকে আদর্শ মুক্তিসংগ্রামী রূপে উপস্থাপিত করেছেন। অপর বাণীটিতে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের কর্মীদের ও জনগণের অচ্ছেদ্য ও গভীর সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন। এই বক্তব্য মূলতঃ তাঁর ঐকতান কবিতার প্রস্তুতি।
সাজ্জাদ জহীরের প্রবন্ধে উদ্ধৃত রবীন্দ্রনাথের এই বাণীর পুরো বয়ানটির উর্দু ভাষ্যকে এখানে বাংলায় তর্জমা করে দিচ্ছি:
“লোকজনের সঙ্গ থেকে নিজেকে দূরে রাখাটা আমার দ্বিতীয় স্বভাবে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু এটাও বাস্তব সত্য যে, যে-লেখক সমাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখে সে মানবজাতির সঙ্গে তার পরিচয়ের সূত্রকে ধরে রাখতে পারে না। বহু সংখ্যক লোকজনের সঙ্গে মিলে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় নিজেকে আলাদা করে রাখলে লেখক তা থেকে বঞ্চিত হয়। সমাজকে জানবার এবং চিনবার জন্য এবং তার প্রগতির পথকে পরিদৃশ্যমান করার জন্য যেটা অপরিহার্য সেটা এই যে, আমাদের সমাজের নাড়িতে হাত রেখে তার হাদ্স্পন্দনকে অনুভব করতে হবে ৷ আমরা মানবমানবীর বেদনার শরিক ও সহচর হতে পারলেই এ কাজটা সম্ভব হতে পারে। মানবসমাজকে শুধু তখনই আমরা চিনতে পারি।
উপরোক্ত যুক্তি থেকেই একথাটা বেরিয়ে আসে যে, জনগণ থেকে দূরে থাকলে আমরা নিজেদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ও অপরিচিত করে ফেলবো। মানুষের সঙ্গে মিলে মিশে নিজেকেও চিনতে হবে। আমার মতো ঘরকুনো হলে কোনো কাজ হবে না। বৃহত্তর কাল ও সমাজ থেকে নিজেকে দূরে রেখে আমি যে বড় রকমের ভুল করেছি, আজ আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। আর এই কারণেই আমার পরামর্শ হলো, আমার চেতনা বলছে, মানবতা ও সমাজকে ভালবাসতে হবে। যদি সাহিত্য মানবতার সঙ্গে একই স্বরে ও সুরে বাজতে সক্ষম না হয় তাহলে সে ব্যর্থকাম ও লক্ষ্যহীন হয়ে পড়বে। এই বাস্তবতা আমার হৃদয়ে সত্যের আলোকশিখা হয়ে জ্বলছে। কোনো যুক্তি-তর্ক প্রমাণের ঝুড়ি একে নেভাতে পারে না।
আজ আমাদের দেশ এক ধু মরুভূমি, যেখানে সবুজের কিংবা জীবনের নাম নিশানা নেই। দেশের প্রত্যেকটি ধূলিকণায় দুঃখের ছবি। আমাদের কাজ হচ্ছে এই দুঃখ ও ক্রন্দনকে মুছে ফেলা এবং নতুন করে জীবনের উদ্যানে জলসিঞ্চন করা। সাহিত্যের সাধনা যারা করবে, তাদের কাজ হবে দেশে নতুন জীবনের প্রাণশক্তিকে উজ্জীবিত করা, জাগরণ ও উৎসাহ উদ্দীপনার গান গাওয়া, প্রত্যেকটি লোককে আনন্দ ও আশার বাণী শোনানো যাতে কেউ নৈরাশ্যে মগ্ন ও ব্যর্থকাম হয়ে না পড়ে। দেশের ও জাতির এই হিতসাধনকে স্বার্থচিন্তার উপর স্থান দেবার কামনাকে ছোট বড় সকলের মনে জাগিয়ে তোলা সাহিত্যের সাধকদের কর্তব্য হওয়া উচিত। জাতি, সমাজ ও সাহিত্যের মঙ্গল সাধনের সংকল্পকে প্রত্যেকটি লোক
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments